ছাত্রজীবনে ফ্রিল্যান্সিং হতে পারে ক্যারিয়ারের প্রথম পদক্ষেপ

ছাত্রজীবনে ক্যারিয়ার গঠনে ফ্রিল্যান্সিং হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ। ছাত্রজীবন ক্যারিয়ার গঠনের একটি প্রস্তুতি পর্ব। এই প্রস্তুতির উপরই মূলত নির্ভর করে পরবর্তীতে ক্যারিয়ার কোন দিকে যাবে । সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচন এবং পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আগাতে হয়। অনেকেই ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন কিংবা বুঝে উঠতে পারেন না যে, ছাত্রজীবনে ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় প্রথম পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত?

 

এমন হাজারো শিক্ষার্থী রয়েছে যারা ছাত্রজীবনে টিউশন করে আয় করে থাকে। টিউশন বা কোন কোচিং ভিত্তিক শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে পড়ানো যেমন সম্মানের তেমনি এটাকে ক্যারিয়ার গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলা যেতে পারে।

 

তবে যারা স্কিল ভিত্তিক দক্ষতা বাড়াতে চায় এবং ক্যারিয়ারে সফল হতে চায় তাদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং হতে পারে সর্বোত্তম পদক্ষেপ। ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্তপেশা একদিকে যেমন ছাত্রজীবনে আয়ের অন্যতম উৎস তেমনি স্কিল ভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানোর প্রধান হাতিয়ার।  

 

ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্তপেশা কি ?

 

মুক্তপেশা মানে হল, ক্লায়েন্ট অনলাইনের মাধ্যমে আপনাকে যে কাজ দিবে, আপনি সে কাজে চুক্তিবদ্ধ হবেন, নিজের দক্ষতা দিয়ে কাজটা করবেন, আর সেটা অনলাইনের মাধ্যমেই ক্লায়েন্টকে ডেলিভার করবেন। আর ক্লায়েন্ট অনলাইনের মাধ্যমেই আপনাকে পেমেন্ট করবে। কাজ মূলত আপনার দক্ষতা দিয়েই করবেন, শুধু মাধ্যমটা হবে অনলাইন।

ছাত্রজীবনে ফ্রিল্যান্সিং গুরুত্বপূর্ণ কেন ?

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪৭% শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেকার, পর্যাপ্ত চাকরির ক্ষেত্র কিংবা প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় মূলত এই বেকারত্ব সমস্যার সৃষ্টি। এমন হাজারো স্নাতক বেকার রয়েছে যাদের স্কিল ভিত্তিক দক্ষতা না থাকায় চাকরি হচ্ছে না। কাজেই ফ্রিল্যান্সিং করে আপনি ছাত্রজীবনেই আপনার স্কিল ভিত্তিক দক্ষতা বাড়িয়ে ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় অগ্রসর হতে পারবেন। ধরে নিন, আপনার আইটি বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে কিংবা ওয়েব নিয়ে। ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য আপনি ওয়েব অথবা আইটি বিষয়ক কোর্স করে নিজেকে ক্যারিয়ার জগতের এক অনন্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবেন। কেননা, মুক্তপেশা কোর্স শুধু আপনাকে টাকা উপার্জনের কৌশলই শেখাবে না। আপনাকে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগে যথেষ্ট অভিজ্ঞ করে তুলবে। আপনার জ্ঞানের সীমাকে প্রসারিত করবে। আপনার কমিউনিকেশন স্কিল, আইটি নলেজ, ওয়েব মার্কেটিং, মার্কেটিং স্ট্রাটেজি, রাইটিং স্কিলকে দ্বিগুণ করে তুলবে।

 

 

কিভাবে এবং কোথা থেকে শুরু করবেন ?

 

শুরুটা সবসময় কঠিন, আজ করবো কাল করবো বলে অনেকে শুরুই করতে পারে না। তবে বিষয়টা সিম্পল, আপনি যদি ফ্রিল্যান্সিং করতে চান তবে আপনাকে ভাল কাজ জানতে হবে আর ভালো কাজ জানার জন্য দরকার ভালো প্রশিক্ষণ ও চর্চা। সেক্ষেত্রে আপনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা অভিজ্ঞ ট্রেইনার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করতে পারেন। তবে অবশ্যই আপনাকে দুটো বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। বিষয়গুলো হলঃ

কি ভালো লাগে

আপনি কোন বিষয়ে ভালো, কোন বিষয়ে আপনার প্রতিভা রয়েছে সেটি আপনাকেই যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ আপনি যে ফিল্ডে বেশি আগ্রহী, সে ফিল্ড ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেয়াই উত্তম। আপনার কোডিং ভালো লাগলে ওয়েব ডিজাইন এন্ড ডেভেলপমেন্ট, এন্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট, ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপমেন্ট কিংবা গেম ডেভেলপমেন্ট বেছে নিতে পারেন। আবার আকাআকি ভালো লাগলে, অর্থাৎ গ্রাফিক নিয়ে আগ্রহ থাকলে লোগো ডিজাইন, বিজনেস কার্ড ডিজাইন, মোশন গ্রাফিক ডিজাইন, ব্যানার ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং বেছে নিতে পারেন। লেখালেখির অভ্যাস থাকলে কন্টেন্ট রাইটিং, রিপোর্ট রাইটিং, ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং বেছে নিতে পারেন। এরকম ভাবে মিউজিক, ফটোগ্রাফি ভালো লাগলে সেটা নিয়েও ফ্রিল্যান্সিং করতে পারবেন।   মূলত কোন সেক্টর নিয়ে কাজ করবেন সেটার উত্তর আপনি নিজেই জানেন।  

উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও চর্চা

আপনি যেকোন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারবেন ঠিকই, তবে কতটুকু শিখতে পারবেন তা নিয়ে থাকে সংশয়। যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা ট্রেইনার থেকে শুরু করবেন, আগে তাদের সম্পর্কে ভালো করে জানুন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভালো, তবুও শিখতে পারছেন না। এর কারণ হলো আপনার শেখার প্রতি অনীহা ও চেষ্টার অভাব। আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে চর্চা এবং পরিশ্রম করতে হবে। এ বিষয়ে বিখ্যাত মনিষী উইলিয়াম ল্যাংলয়েড বলেছেন,

 

যেখানে পরিশ্রম নেই সেখানে সাফল্য ও নেই

 

 

 

 

জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং ফিল্ড  

 

ফ্রিল্যান্সিং ফিল্ড বেশ প্রশস্ত। তবে জনপ্রিয় ফিল্ডগুলো হলঃ

– ওয়েব ডিজাইনএন্ড ওয়েব ডেভেলপমেন্ট

– গ্রাফিক ডিজাইন

– এন্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট

– গেম ডেভেলপমেন্ট

– ওয়ার্ডপ্রেস থিম কাস্টমাইজেশন

– এফিলিয়েট মার্কেটিং বা ডিজিটাল মার্কেটিং

– এসইও এক্সপার্ট

– ডাটা এন্ট্রি

– কন্টেন্ট বা আর্টিকেল রাইটিং

– লোগো ডিজাইন

– ভিডিও এডিটিং

– এনিমেশন ডিজাইন

– ইমেইল ও ফেসবুক মার্কেটিং

– প্লাগইন ডেভেলপমেন্ট  

– সেলস কনসাল্টেন্ট

– ইউটিউব মার্কেটিং এন্ড স্ট্রাটেজি

 

কাদের জন্য এই ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত-পেশা?

– যাদের অতিরিক্ত লোভ নেই।

– যারা কাজ শেখার ধৈর্য রাখে।

–  পরিশ্রম করতে জানে।

–  সৎ পথে জীবিকা উপার্জন করতে চায়।

– যাদের শেখার প্রবণতা আছে।

– যারা অল্পতেই হতাশ না হয়ে সফলতার আশা করে।

 

কাদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্তপেশা না

 

– যারা শর্টকাট পদ্ধতিতে বড়লোক হতে চায়।

– যাদের ধৈর্য একবারেই কম।

– যারা কিছু না শিখেই উপার্জন করতে চায়।

– যারা সবকিছু ফ্রি তে পেতে চায়।

– ফ্রিল্যান্সিং কে খুব সহজ মনে করে।

 

কিছু পরামর্শঃ

 

– যেহেতু ছাত্রজীবনে ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরু করবেন, অবশ্যই নিজের পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

– নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান থাকতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং করে অনেকে রাত-দিন কাটিয়ে দেয় ক্লায়েন্টের কাজ করার জন্য। মনে রাখতে হবে, আপনি নিজে সুস্থ না থাকলে ক্লায়েন্টের কাজ কিভাবে করবেন ?

 

– ফ্রিল্যান্সিং- কে একমাত্র আয়ের উৎস না বানিয়ে পরবর্তীতে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করুন।

 

– ধৈর্যশীল হউন এবং পরিশ্রম করতে শিখুন। কেননা পরিশ্রম সফলতার প্রধান চাবিকাঠি।

 

– যারা প্রশিক্ষণ সেন্টারে গিয়ে শেখাটা ঝামেলা মনে করেন, তারা অনলাইন ট্রেইনিং সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ নিন।   

 

 

লিখেছেনঃ মুশফিকুর রহমান